পয়সা উসুল করতে চাওয়া কি ঠিক সবসময়? (The Sunk Cost Trap)

খাঁটি বাংলায় বললে, এই উসুল করার চক্করে পড়ে আমরা যখন আরও বড় লোকসানের দিকে পা বাড়াই, তাকেই বলে ‘সাঙ্ক কস্ট ইফেক্ট’।

একটু টার্মটার দিকে লক্ষ করি। Sunk হচ্ছে Sink এর past participle. মানে অলরেডি ডুবে গেসে🤦‍♂️🚢. Sunk cost হচ্ছে কোন বিজনেসে আপনার যে টাকাটা ইতিমধ্যেই খরচ হয়ে গেসে। যা আর Recover করা যাবে না।

এই জিনিসটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে হয়, বিজনেসের ক্ষেত্রে হয়।

ধরুন, কোন বিজনেসে আপনি প্রাইমারী ইনভেস্টমেন্ট করে ফেলসেন। এরপর ক্লিয়ার বুঝতে পারলেন এর ভবিষ্যৎ অন্ধকার অর্থাৎ, এটি লাভজনক কোন উদ্যোগ হবে না কিন্তু ব্যবসা থেকে সরে আসলেন না শুধুমাত্র প্রাইমারী ইনভেস্টমেন্ট করে ফেলসেন এই অযুহাতে। এই ব্যাপারটাই সাঙ্ক কস্ট বায়াস বা আমাদের ব্রেইনের এক অদ্ভুত সীমাবদ্ধতা।

১. বাজে মুভির সেই চিরচেনা ফাঁদ
ধরুন, আপনি অনেক শখ করে একটা মুভি দেখতে বসলেন। ৩০ মিনিট দেখার পর বুঝলেন মুভিটা অসম্ভব রকমের ফালতু। কিন্তু আপনি ভাবলেন— “আরে, ৩০ মিনিট তো দেখেই ফেললাম, এখন বন্ধ করলে সময়টা লস হবে!” এই ভেবে আপনি আরও দেড় ঘণ্টা বসে মুভিটা দেখলেন।

ফলাফল? আপনার প্রথম ৩০ মিনিট তো আগেই গেছিল, এখন পরের দেড় ঘণ্টাও নষ্ট হলো। অথচ প্রথম ৩০ মিনিট পরেই মুভিটা বন্ধ করলে আপনি ওই সময়টুকু অন্য কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে লাগাতে পারতেন।

২. সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কি আমরা ‘উসুল’ খুঁজি?
ব্যবসা বা মুভির বেলায় শুধু নয়, এই ফাঁদটা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও খুব প্রকট। অনেক সময় আমরা একটা Toxic সম্পর্কে বছরের পর বছর আটকে থাকি। অজুহাত দেই— “আমাদের ৫ বছরের সম্পর্ক, এখন ছেড়ে দিলে এই ৫টা বছর বৃথা যাবে!” বাস্তবতা হলো, ওই ৫ বছর তো সাঙ্ক কস্ট বা ‘ডুবে যাওয়া সময়’। সেটা আর ফিরবে না। কিন্তু তাকে বাঁচাতে গিয়ে আপনি কি আপনার আগামীর আরও ৫ বছর বা পুরো জীবনটা নষ্ট করবেন?

কেন আমরা এই ভুলটা করি?
সাঙ্ক কস্ট ইফেক্ট যে একটি Cognitive Bias বা আমাদের চিন্তার ত্রুটি, তার পেছনে ৩টি মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছেঃ

১. লস অ্যাভারশন (Loss Aversion)
ভাবুন তো, রাস্তায় ৫০ টাকা কুড়িয়ে পেলে আপনি যতটা না খুশি হবেন, নিজের পকেট থেকে ৫০ টাকা হারিয়ে গেলে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন না? এই হারানোর ভয়ই আমাদেরকে ভুল সিদ্ধান্তে আটকে রাখে।

২. ইগো এবং সামাজিক ইমেজ (Impression Management):
আমরা অন্যদের কাছে বা নিজের আয়নার সামনে “ব্যর্থ” হতে চাই না। কোনো প্রজেক্ট বন্ধ করে দেওয়া মানে হলো আমাদের আগের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। এই Cognitive Dissonance বা মানসিক অস্বস্তি এড়াতে আমরা অলাভজনক কাজ চালিয়ে যাই।

৩. প্ল্যান কন্টিনুয়েশন বায়াস (Plan Continuation Bias):
আমাদের ব্রেইন কোনো পরিকল্পনা শুরু করলে সেটাকে শেষ করতে চায়। মাঝপথে থেমে যাওয়াটাকে ব্রেইন একটা “অসমাপ্ত কাজ” হিসেবে দেখে অস্বস্তি তৈরি করে।

একটি বিশ্ববিখ্যাত উদাহরণ: কনকর্ড বিমান (The Concorde Supersonic Jet)
ব্রিটিশ এবং ফরাসি সরকার এক সময় জানত যে ‘কনকর্ড’ সুপারসনিক বিমানটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হবে না। কিন্তু তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আরও খরচ করেছিল শুধু এই যুক্তিতে— “ইতিমধ্যেই তো অনেক খরচ হয়ে গেছে, এখন থামলে মান-সম্মান থাকবে না!” ইতিহাসে একে Concorde Fallacy বলা হয়।

The “Golden Rule” of sunk costs:> If you wouldn’t spend the next dollar or hour on this project if you were starting fresh today, you shouldn’t spend it now. The money already spent is gone regardless of what you do next.

যদি আজ নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকতো এবং আপনি এই প্রজেক্টে আপনার পরবর্তী ১টি টাকা বা ১টি ঘণ্টাও ব্যয় করতে রাজি না থাকতেন, তবে এখনো সেটা করবেন না।

এই মোহ থেকে বাঁচার একটি সহজ কৌশল (The Outsider Test)
নিজেকে সাঙ্ক কস্ট থেকে মুক্ত করতে একটি মানসিক ট্রিক ব্যবহার করা যেতে পারে, যাকে বলা হয় ‘আউটসাইডার টেস্ট’:

নিজেকে প্রশ্ন করুন: “যদি আজ আমি এই প্রজেক্ট বা সম্পর্কে নতুন হতাম এবং আগের কোনো বিনিয়োগ না থাকতো, তবে কি আমি আজ এখানে ইনভেস্ট করতাম?”

উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে বুঝবেন আপনি কেবল মায়ার টানে বা ইগোর কারণে আটকে আছেন।

শেষ কথাঃ
আপনার জীবনেও কি এমন কোনো ‘মুভি’ চলছে যা আপনি শুধু ‘শুরু করেছেন’ বলেই শেষ করার চেষ্টা করছেন? মনে রাখবেন, গর্তে পড়ে গেলে প্রথম কাজ হলো গর্ত খুঁড়া বন্ধ করা। অতীতকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই, কিন্তু ভবিষ্যতের সময়টাকে বাঁচানোর সুযোগ আমাদের হাতেই।

আমাদের চারপাশের অনেক মানুষই হয়তো কোনো না কোনো ‘মৃত ঘোড়া’ (Dead Horse) টানছেন এই আশায় যে সেটি একদিন দৌড়াবে।

আপনার কি মনে হয়, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা বা ক্যারিয়ার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কি এই সাঙ্ক কস্ট ইফেক্ট কাজ করে? যেমন— ৪ বছর একটা বিষয়ে পড়ার পর সেটা ভালো না লাগলেও সারাজীবন সেই পেশাতেই আটকে থাকা?

আপনার আজকের কোনো সিদ্ধান্ত কি সাঙ্ক কস্ট দ্বারা প্রভাবিত? কমেন্টে শেয়ার করতে পারেন!

Previous Article

হেলো আর হর্ণের মায়াজালে

Next Article

কেন আপনার সাব-অর্ডিনেটকে প্রশংসা করবেন

Write a Comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe to our Newsletter

Subscribe to our email newsletter to get the latest posts delivered right to your email.
Pure inspiration, zero spam ✨